জয়দেব কেন্দুলি মেলা
Joydev Kenduli Mela

History

কেন্দুবিল্ব বা কেন্দুলীর মেলা কত বছরের প্রাচীন তা এই মুহূর্তে সুনিশ্চিত করে বলা যাবে না, তবে তার ধর্মাচরণ ও লৌকিক প্রথা অনুধাবন ও পর্যালোচনা করে বলা যায় যে সর্বভারতীয় মন্ডলে পূর্ণ্যস্নান (কুম্ভ ও গঙ্গা সাগরের মত) ভিত্তিক মেলাগুলির অনুরূপ এই জয়দেব কেন্দুলীর মহা মেলাটির বয়সও খুবই প্রাচীন। এবং এই মেলাটির সঙ্গে গঙ্গাসাগর ও কুম্ভ মেলায় মকরস্নান কৃত্যের সমলিনতা অনুধাবন যোগ্য। কুম্ভে নাগা সন্ন্যাসী, গঙ্গাসাগরে উত্তরপ্রদেশের সেবায়ত মহন্তদের মত জয়দেব কেন্দুলীর মকর স্নানের অগ্রাধিকার রয়েছে বৃন্দাবন নির্ম্বাক সম্প্রদায়ের মহন্তদের। পঞ্চাশ বছর পূর্বেও দেখা যেত জয়দেবর মহন্তগণ মকর স্নানের দিন অর্থাৎ পৌষ সংক্রান্তির পূণ্যলগ্নে সপরিষদ এমনকি হাতির উপর চেপেও অজয় নদীতে স্নান করতে যেতেন। তাঁরাই প্রথম মকর স্নান উদ্ধোধন করতেন। মকর স্নানকে কেন্দ্র করেই এই মেলা হত একদিনের পরবর্তীকালে জয়দেবের মহন্ত রাই এই নদীর চরের মেলাকে ডাঙ্গায় নিয়ে আসেন। কবি জয়দেব গোস্বামী তাঁর জন্মভূমি কেন্দুবিল্বদ গ্রামে দ্বাদশ শতকের জন্ম গ্রহণ করেন এবং রাধাকৃষ্ণের প্রেমের উপাখ্যান, শ্রী শ্রী গীতগোবিন্দম্ রচনা করেন ঐ শতাব্দীর শেষদিকে প্রথমে গৌড় এবং তারপর পুরী এবং শেষ জীবন বৃন্দাবনে অতিবাহিত করেন।

বৃন্দাবনের তাঁর দেহান্তর ঘটে, টাট্রিস্থান আখড়ার তাঁর সমাধি দেওয়া হয়। সম্ভবতঃ এটি ইংরাজী ১২০৩ সালের ঘটনা। কিংবদন্তী মূলক তথ্য হচ্ছে – কবি জয়দেবের মৃত্যু ঘটেছিল ঐ সালের জানুয়ারী মাসের মাঝামাঝি বা বাংলা বা বাংলার পৌষ সংক্রান্তি তিথিতে। এর থেকে বোঝা যায় যে, সারা ভারত ব্যাপী মকরস্নানের সঙ্গে কেন্দুলীর অজয় স্নানে আর একটি মাত্রা যোগ হয়েছিল, তা হছে – ‘জয়দেব তর্পণ’। কবি জয়দেবের তিরোধান কেন্দ্র করে এই মেলার সুচনা তা আজও সেইভাবেই চলে আসছে। জয়দেব তর্পণ’কে কেন্দ্র করে যদি মেলার সুচনা হয়ে থাকে তবে এ মেলার বয়স শ্রীচৈতন্য পূর্ববর্তী বলে মেনে নিতে হয়। কেননা গৌরাঙ্গ দেবের গুরুর গুরু (ঈশ্বর পুরীর দীক্ষা গুরু) মাধবেন্দ্র পুরী কেন্দুলীর মকর স্নানের মেলায় যোগ দিয়েছিলেন|

জয়দেব কেন্দুলীর শ্রীশ্রীনির্ম্বাক আশ্রম : এখানে একটি কথা স্পষ্ট করে বলা ভাল, যে এই জয়দেব কেন্দুলীর মেলাটি নিম্বার্ক সম্প্রদায়ের বৈষ্ণব মেলা| শ্রীশ্রী রাধা বিনোদ মন্দিরের পশ্চিম অর্থাৎ জয়দেব মন্দির বলে সেটি সুপরিচিত, সেই মন্দির্রের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত নিম্বার্ক আশ্রম| নিম্বার্ক সম্প্রদায়ের বৈষ্ণব মহান্তদের বিশ্বাস - গীতগেবিন্দম প্রণেতা কবি জয়দেব তাঁদের অন্যতম কুলগুরু| বৃন্দাবন টাট্রিস্থান নামক নিম্বার্ক আশ্রম রক্ষিত গুরু পরম্পরা তালিকায় উল্লেখিত ছেচল্লিশতম গুরুর নাম – কবি জয়দেব| বৃন্দাবনের নিম্বার্ক মহান্তগন এমনও বিশ্বাস করেন কবি জয়দেবর তাঁদের কুলগুরু| তাই দ্বাদশ বঙ্গাব্দের ষষ্ঠ দশকে মহন্ত রাধারমণ ব্রজবাসী এই আশ্রমের প্রতিষ্ঠা করেন| তবে কেন্দুলীর পূর্বাপর মহন্তরাও ক্রমশ দেবোত্তর সম্পত্তি পেয়েছিলেন বর্ধমান রাজ্যের কাছ থেকে| এবং একই ভাবে এই মেলার উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব পাওয়ার পর মহন্ত ফুলচাঁদ ব্রজবাসী সুষ্ঠ ভাবে মেলা পরিচালনা করতেন| জানা যায় – প্রথম থেকেই মেলা পরিচালনায় আশ্রম কর্মচারীদের কাজে লাগাতেন| অজয় তীরে ও পুস্করনীর পাড়ে নিয়োগ করা হত পাহারাদার, সিপাই, পদাতিকারদের লাগান হত মেলার শান্তি রক্ষার কাজে| আর মেলা প্রাঙ্গনের ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার করার জন্য নিযুক্ত করা হত প্রচুর মেথর| তখন মহন্তরাই মেলার খাজনা আদায় করতেন| যে আয় হত তা দেবদেবীর পূজা, অতিথি সেবা এবং আশ্রম ও মেলা পরিচালনা করতে খরচ হত| মেলার সময় বহু সাধু মহান্ত বৈষ্ণব-বৈষ্ণবী ও সাধারণ মেলা যাত্রীদের আশ্রয় ও সেবা দেওয়া হত| এছাড়াও মহন্তদের উদ্যোগে গীতগোবিন্দ পাঠ, সাহিত্য সভা, ধর্মসবা, কীর্তন এবং নীলকন্ঠের গান হত বলে জানা যায়| তবে ১৮৮১ সাল থেকে এই মেলা পরিচলানার ভার আর মহন্তদের নেই, চলে এসেছে সরকার পরিচালিত মেলা কমিটির হাতে|

বিভিন্ন আখড়া ও আশ্রম আসার কারণ : কবি কুল চূড়ামণি জয়দেব গোস্বামী যে শুধু বৈষ্ণব কবি ছিলেন তা নয়| তিনি তাঁর পূর্বকালের ও সমকালে প্রচলিত সকল সম্প্রদায়ের বৈষ্ণব ধর্মের এক সমন্বয়মূলক আদর্শের ভিত্তিতে রচনা করেছিলেন শ্রীশ্রীগীতগেবিন্দম্| তাই ধারণা হয় গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মতো আর সব বৈষ্ণবরা জয়দেব কবির জন্মস্থান কেন্দুলীর চতুর্পাশ্বস্থ অঞ্চলে আশ্রম ও আখড়া স্থাপন করে বসবাস করে আসতেন| এমন ৬৪ টি গ্রামের নাম পাওয়া যায়| এই সব গ্রামে প্রাক গৌড়ীয় ও বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের আখড়া ছিল| বর্তমানে অধিকাংশ আখড়ায় বিলুপ্ত, আর যে সব আখড়া এখনও আছে সেই সব আখড়া গৌড়ীয় সহজীয়া, বাউল, দরবেশ প্রভৃতি বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অধিকৃত দেখা যায়| ঐ সব আশ্রম আখড়ার প্রতিষ্ঠাতা বৈষ্ণবরা জয়দেব মেলায় আসতেন| কবি বনমালী দাস “জয়দেব চরিত্র” এ লিখেছেন – চারি সম্প্রদায় বৈষ্ণব আইসে কত শত / আর অজয় কিনারে সভে আখড়া বাঁধিল অথবা অজয় কিনারে সভে বৈষ্ণবেরগণে / পরমানন্দে মহোচ্ছব করে রাত্রি দিনে| তাহলে প্রাক গৌড়ীয় সকল বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ধর্মাদর্শের সঙ্গে গীতগোবিন্দের অল্প বিস্তার মিল পাওয়া যায়| আর এই কারণেই উক্ত সকল সম্প্রদায়ের মানুষগণ বৈষ্ণব কবিজয়্দেবকে আপন করার জন্য কেন্দুলী গ্রামে এসে আখড়া ও আশ্রম স্থাপন করেন| কবি জয়দেবের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন| আরো জানা যায়, কেন্দুলির চারিদিকে অবস্থিত বিভিন্ন বৈষ্ণব আখড়া আশ্রমের অধিকারীরা মেলার দু-দিন আগে মহোৎসব ও অন্নসত্র এর আয়োজন করতেন| আজও এই প্রথা সমানে প্রচলিত আছে| এছাড়া প্রাচীন কেন্দুলীর আঙ্গিকে বৈষ্ণব বাউলেরা সমবেত হতেন| এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক কৃষ্ণনাথ মল্লিক বলেছেন “রাষ্ট্রীয় দ্বাদশ শতকে কবি জয়দেব বিলাশ করার স্রোতকে হরি স্মরণের শাসনে বাঁধেন| আর খ্রীঃ অষ্টাদশ শতকে বীরভদ্র নেড়া-নেড়ীদের দেহভিত্তিক অসঙ্গত ধরমচারণকে বৈষ্ণব ধর্মের গন্ডিতে আবদ্ধ করেন| তারই কোনো নির্দেশ ছিল পৌষ সংক্রান্তির পুন্য দিনে বৈষ্ণব ও বাউল সম্প্রদায়ের মানুষকে কেন্দ্রবিল্বে অজয় তীরে সমবেত হওযার|” আর এও জানা যায়, দেশের নানা স্থান থেকে মেলায় আগত বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীরা অনকেই আর ফিরে যেতেন না| স্থায়ীভাবে বসবাস করতে তাঁরা থেকে যেতেন গ্রাম কেন্দুলিতে| এভাবেই অজয় তীরে বরাবর খ্রীঃ অষ্টাদশ শতকেই গড়ে উঠেছিল এই বৈষ্ণব পাড়া| আজও দেখা যায় কদমখন্ডীর ঘাটে স্বল্প দূরে একটি পতিত জায়গার নাম বৈষ্ণব পাড়া|আর এক সময় এখানেই গড়ে উঠেছিল বৈষ্ণব-বাউলদের আস্তানা বা আশ্রম বা আখড়া| কেন্দুলীর গোদা পুষ্করিণীর উত্তরপাড়ে অবস্থিত দু’একটি প্রাচীন আখড়ার উল্লেখ পাওয়া যায়| আর জগৎ ক্ষ্যাপার প্রাচীন আকাড়াও ছিল কদমখন্ডী এলাকায়| এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তান্তিক সাধক কাঙাল ক্ষ্যাপার আশ্রম| আর খ্রীঃ বিশ শতকের বিভিন্ন সময় এখানেই একে একে প্রতিষ্ঠত হয়েছে নানা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের আশ্রম| আর এভাবেই বিভিন্ন আশ্রম আখড়া প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে তীর্থক্ষেত্র হিসাবে অজয় কেন্দুলীর গুরুত্ব ক্রমশ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দুলী মেলা বিখ্যাত হয়েছে দেশ-দেশান্তরে| প্রসঙ্গত বলা যায় কবি জয়দেবের স্মৃতির আর এভাবেই বিভিন্ন আশ্রম আখড়া প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে তীর্থক্ষেত্র হিসাবে আজও কেন্দুলীর গুরুত্ব ক্রমশঃ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দুলী মেলা বিখ্যাত হয়েছে দেশ-দেশান্তরে| প্রসঙ্গত বলা যায় কবির জয়দেবের স্মৃতির উদ্দেশ্যে বর্ধমানের মহারাণী ব্রজকিশোরী দেবী (নৈরাণী) ১৬১৪ সকাব্দে কেন্দুলীর শ্রীশ্রীরাধাবিনোদ মন্দির নির্মান করে দিয়েছিলেন| টেরাকোটায় অপূর্ব কারুকার্য করা নবরত্ন এই মন্দিরটির ভারতীয় পূরতত্ত্ব বিভাগ ১৯৫৮ খ্রীষ্টাব্দে অধিগ্রহন করে অংশিক সংস্কার করা হয়| বর্তমানে এটি জয়দেব মন্দির বলে বিশেষভাবে পরিচিত ও জয়দেবের প্রধান দ্রষ্টব্য স্হান|

২০১৬ সনে প্রকাশিত

কৃতঞ্জতা স্বীকার- দেউল পত্রিকা

Contact With Us

JoydevMela

Joydev-kenduli
Illambazar Block
Birbhum, WB

Pin-731124